নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
আজ সেই ৫ আগস্ট। বাঙ্গালীদের মুক্তির দিন।
দীর্ঘ ১৫ বছরের আওয়ামী লীগ সরকারের স্বৈরাচারী শাসনের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করার দিন।
ছাত্র-জনতার রক্তস্নাত সেই বিজয়ের দিন ফিরে এসেছে।
গত বছর আজকের এই দিনে আপামর ছাত্র-জনতা বিজয়োল্লাসে জাতীয় পতাকা হাতে ঘর ছেড়ে পথে নেমে এসেছিলেন।
আপামোর জনতার হাতে ছিল লাল সবুজের পতাকা আর মুখে ছিল দেশ বিজয়ের স্লোগান।
সে দিন বেলা ৩টা, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট।
সেনাপ্রধানের ভাষণের অপেক্ষা না করে মুক্তির আনন্দে বেরিয়ে পড়ে দেশের সর্বশ্রেণির মানুষ।
প্রতিটি গলির মুখ থেকে বেরিয়ে পড়ে খণ্ড খণ্ড মিছিল।
এই মিছিলে ছোট্ট শিশু থেকে শুরু করে কলেজ ড্রেস পরা বালক-বালিকা সবাই অংশ নেয়।
কপালে পতাকা বাঁধা তরুণ-তরুণী, মসজিদের ইমাম, পাড়ার সবজি বিক্রেতা।
সাদা চুলে মেহেদি পরা বৃদ্ধ। একে একে সেই মিছিলে শরিক হচ্ছেন সবাই। গন্তব্য রাজপথ। সবার মুখে বিজয়ের স্লোগান! দেশমাতৃকার নাম বাংলাদেশ! বাংলাদেশ!
দিনটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপ্রতি মো. সাহাবুদ্দিন ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ছাত্র-জনতাকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে বাণী দিয়েছেন।
রাষ্ট্রপতি তাঁর বাণীতে বলেছেন,‘বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও ফ্যাসিবাদী অপশাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র-শ্রমিক-জনতা সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলে ২০২৪ সালের এই দিনে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বাণীতে বলেছেন, ‘জুলাই আমাদের নতুন করে আশার আলো- একটি ন্যায় ও সাম্যভিত্তিক, বৈষম্য ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছে।
ছাত্র-জনতার রাজপথে নেমে আসার এই রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের শুরুটা হয়েছিল ২০২৪ সালের জুলাইয়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কোটাবিরোধী আন্দোলন থেকে।
তারা তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের চাকরিতে কোটা সংরক্ষণের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে স্লোগান তোলে- কোটা না মেধা! মেধা, মেধা! মেধাবী শিক্ষার্থীদের সেই স্লোগান ধীরে ধীরে এক দফায় পরিণত হয়।
সবার মুখে একই কথা- এক দফা, এক দাবি/ হাসিনা তুই কবে যাবি!
জুলাইজুড়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ক্রমশ দেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে।
সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল, কলেজ, মক্তব, মাদরাসা- সব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে আসে।
১৬ জুলাই দুপুরে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পার্ক মোড়ে বুক পেতে দাঁড়িয়ে থাকা আবু সাঈদকে লক্ষ্য করে গুলি করে পুলিশ।
হাসপাতালে নেওয়া হলে মারা যান তিনি।
নিরস্ত্র আবু সাঈদের গুলিবিদ্ধ হওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
প্রায় একই সময়ে চট্টগ্রামে শাহাদাতবরণ করেন ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম! হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে সোচ্চার হয় সাধারণ মানুষ।
কোটা সংস্কার আন্দোলন তখন সরকার পতনের আন্দোলনে রূপান্তরিত হতে থাকে। বাড়তে থাকে শহীদের সংখ্যা।
একের পর এক পড়তে থাকে লাশ। গুলিতে ঝাজরা হয়ে যায় ছাত্র-জনতার বুক।
স্বৈরাচারের হাত থেকে রক্ষা পাইনি বাসার বেলকুনিতে খেলা করা ২ বছর ও ৪ বছরের শিশুরাও।
৩ আগষ্ট শেখ হাসিনা প্রশাসনকে নির্দেশ দেয় যেভাবেই হোক আন্দোলন দমাতে হবে।
এই আন্দোলনে যদি দেশের অর্ধেক শিক্ষার্থীর জীবন যায় যাক সমস্যা হবে না।
কিন্ত আমার ক্ষমতা গেলে সমস্যা হবে। তোমরা যে ভাবে পার আন্দোলনকারীদের ওপর ফায়ার কর।
এতে সবাই ভয় পেয়ে চলে যাবে। এর পরই শুরু হয় নির্বিচারে গুলি চালানো।
পশুরমত মানুষ মেরে লাশে আগুন ধরিয়ে দেয়।
সারা দিন চলে ছাত্র-জনতা ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ।
৪ আগষ্ট সকাল থেকেই রাজধানীর দিকে আসতে শুরু করে ছত্র-জনতা।
ছাত্র-জনতাকে লক্ষ করে গুলি করে পুলিশ।
৪ আগষ্ট রাজধানীর যাত্রাবাড়িতে মিছিলে গুলি চালায় পুলিশ।
এতে কয়েকশ মানুষ মারা যায়। তাদের লাশ স্তুপ করে রাখে।
৫ আগষ্ট শুরু হয় সরকার পতনের মুল অধিবেশন। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে গণভবনের দিকে আসতে থাকে মানুষ।
তাদের লক্ষ করে গুলি চালায় পুলিশ। জনতার চাপের মুখে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে পুলিশ পালাতে শুরু করে।
সেনাবাহিনী জনতাকে বাাঁধা দেয় নি। বেলা ১২.৩৫ এ যখন পরিস্থিতি খুব খারাপের দিকে তখন গণভবন থেকে হেলিকপ্টারে পালিয়ে ভারতের দিল্লিতে আশ্রয় নেয় স্বৈরাচার শেখ হাসিনা।
পতন হয় ফ্যাসিবাদি যুগের। শুর হয় বাংলাদেশের নতুন অধ্যায়।